নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামের অভিজাত আবাসিক এলাকা খুলশীর একটি আটতলা ভবন। সেখানে একসঙ্গে অবস্থান করছিলেন ৬৩ জন বিদেশি নাগরিক। তাদের কারও কাছে পাওয়া যায়নি পাসপোর্ট কিংবা নগদ টাকা বা ডলার। অথচ একই ভবন থেকে উদ্ধার হয়েছে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপসহ মোট ১৭০টি ডিজিটাল ডিভাইস।
পুলিশের দাবি, ভবনটি ভাড়া নিয়ে বিদেশিরা অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছিলেন। তবে অভিযান শেষে এসব কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট ধরন এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এত বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিককে এনে খুলশীর ওই ভবনে আসলে কী কাজ করানো হচ্ছিল?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তাদের পাসপোর্ট গেল কোথায়?
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশির কারও কাছ থেকেই পাসপোর্ট পাওয়া যায়নি। উদ্ধার হয়েছে তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র ও একটি কম্বোডিয়ান এমপ্লয়মেন্ট কার্ড। পুলিশের দাবি, ‘মহসিন’ নামে এক ব্যক্তির কাছে অধিকাংশ পাসপোর্ট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
এই তথ্য সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠছে—বাংলাদেশে এসে ৬৩ বিদেশি নাগরিকের পাসপোর্ট একজন ব্যক্তির কাছে থাকার কারণ কী? তারা কি স্বেচ্ছায় পাসপোর্ট জমা দিয়েছিলেন, নাকি তাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট নিয়ে নেওয়া হয়েছিল? যদি নিয়ে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এর পেছনে উদ্দেশ্য কী ছিল?
পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় ছয় মাস আগে পুরো ভবনটি ভাড়া দেওয়া হয়। মাসিক ভাড়া ছিল আনুমানিক ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। ভবনটির মালিক দুবাইপ্রবাসী বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
একটি পূর্ণ ভবনে কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন দেশের ৬৩ নাগরিক অবস্থান করলেও বিষয়টি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারা ভবনটি ভাড়া নিয়েছিলেন? কোন পরিচয়ে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল? বাড়ির মালিককে কী পরিচয় দেওয়া হয়েছিল? ভাড়াটিয়াদের পাসপোর্ট ও বৈধ কাগজপত্র যাচাই করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুলিশের তথ্যে ‘মহসিন’ নামে একজনের কথা এসেছে। বলা হচ্ছে, তিনিই ভবনটি ভাড়া নিয়েছিলেন এবং বিদেশিদের বিভিন্ন বিষয় দেখভাল করতেন। এমনকি তাদের পাসপোর্টও তার কাছে থাকার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
ফলে তদন্তের কেন্দ্রে এখন শুধু ৬৩ বিদেশি নন; ভবনটি ভাড়া নেওয়া ব্যক্তি, স্থানীয় সহযোগী এবং বিদেশিদের বাংলাদেশে আনার পুরো প্রক্রিয়াটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অভিযানে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, ট্যাব, সিপিইউ, মনিটর, প্রিন্টার, পেনড্রাইভ ও সিমকার্ডসহ বিপুলসংখ্যক ডিজিটাল সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
কিন্তু কথিত অনলাইন কার্যক্রমের কেন্দ্র থেকে নগদ টাকা বা মার্কিন ডলার উদ্ধারের তথ্য নেই। ফলে প্রশ্ন উঠছে—যদি অনলাইন প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায় করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্থ কোথায়?
ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, ক্রিপ্টোকারেন্সি, বিদেশি ডিজিটাল ওয়ালেট কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে অর্থ লেনদেন বা স্থানান্তর করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
পুলিশ জানিয়েছে, জব্দ করা ডিভাইসগুলো ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে। ওই পরীক্ষার মাধ্যমে অনলাইন কার্যক্রম, যোগাযোগ, লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
পুলিশ এখনো কথিত প্রতারণার সুনির্দিষ্ট ধরন নিশ্চিত করতে পারেনি। তবে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, অনলাইন মার্কেটিংয়ের আড়ালে পণ্য দেওয়ার কথা বলে অগ্রিম অর্থ নেওয়া কিংবা ‘হানিট্র্যাপ’-জাতীয় প্রতারণার সঙ্গে কেউ কেউ জড়িত থাকতে পারেন।
অন্যদিকে ভবনটি থেকে অনলাইন জুয়ার কোনো কার্যক্রম পরিচালিত হতো কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। তবে এখন পর্যন্ত পুলিশ প্রকাশ্যে এমন কোনো তথ্য বা প্রমাণ দেয়নি যে গ্রেপ্তার বিদেশিরা অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ফলে বিষয়টি আপাতত তদন্তের অংশ হিসেবেই রয়েছে।
জব্দ করা মোবাইল, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ডিভাইসের ফরেনসিক বিশ্লেষণে কোন ধরনের ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার করা হতো, কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হতো এবং অর্থের লেনদেন কীভাবে পরিচালিত হতো—এসবের উত্তর মিলতে পারে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশিদের বাংলাদেশে আনা হয়ে থাকতে পারে। তাদের অনেকেই ইংরেজি বলতে বা বুঝতে না পারায় প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলেও জানা গেছে।
এতে সামনে এসেছে আরও কিছু প্রশ্ন—কারা তাদের নিয়োগ দিয়েছিল? কার মাধ্যমে তাদের ভিসা করা হয়েছিল? কোন প্রতিষ্ঠানের নামে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন? বাংলাদেশে এসে কেন তাদের একটি আবাসিক ভবনে রাখা হয়েছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে বিদেশিদের বাংলাদেশে আনার পেছনে থাকা নেটওয়ার্ক সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
একটি বড় ভবন কয়েক মাসের জন্য ভাড়া নিয়ে সেখানে বিভিন্ন দেশের ৬৩ নাগরিকের বসবাস এবং রান্নার জন্য বাবুর্চি নিয়োগ—সব মিলিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিষয়টি কতটা গোপন ছিল, সেই প্রশ্নও উঠেছে। দেশভেদে বিদেশিদের আলাদা করে রাখা হয়েছিল বলেও জানা গেছে।
তবে শুধু ভবন মালিক বা স্থানীয় কারও সঙ্গে ভাড়ার সম্পর্ক থাকলেই অপরাধে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয় না। তাদের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে—এমন তথ্যও এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
তাই তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে, ভবন ভাড়া দেওয়ার সময় মালিকপক্ষ ভাড়াটিয়াদের প্রকৃত পরিচয় ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কতটা জানতেন এবং তারা কোনো ধরনের সহায়তা করেছিলেন কি না।
৬৩ বিদেশিকে গ্রেপ্তার করাই এই ঘটনার শেষ নয়; বরং প্রকৃত তদন্তের শুরু এখান থেকেই হতে পারে। কারণ একটি ভবনে ৬৩ বিদেশি নাগরিকের অবস্থান, ১৭০টি ডিজিটাল ডিভাইস উদ্ধার, কারও কাছে পাসপোর্ট না থাকা এবং একজন স্থানীয় ব্যক্তির কাছে অধিকাংশ পাসপোর্ট থাকার তথ্য—সবকিছু মিলিয়ে ঘটনাটি নিয়ে আরও গভীর তদন্তের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে পশ্চিম খুলশীর ৩ নম্বর রোডের মো. মামুনের নাম বাড়ির মালিকপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে উঠে এসেছে। এ ছাড়া কক্সবাজারের পেকুয়ার বাসিন্দা আক্কাস আলীর নামও বাড়ির মালিকপক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে এখনো কোনো চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তে বের করা প্রয়োজন—কারা এসব বিদেশি নাগরিককে বাংলাদেশে এনেছে, কারা ভবনটি ভাড়া নিয়েছে এবং কার কাছে তাদের পাসপোর্ট ছিল। তারা কোন ভিসায় দেশে প্রবেশ করেছেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, কোথা থেকে অর্থ আসত এবং কোথায় যেত—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পাশাপাশি কোন ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার করা হতো, কথিত অনলাইন প্রতারণার প্রকৃত ধরন কী ছিল এবং অনলাইন জুয়া বা অন্য কোনো সাইবার অপরাধের সঙ্গে তাদের যোগসূত্র ছিল কি না—সেটিও তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
খুলশী থানার ওসি মো. আব্দুর রহিম বলেন, “আমরা মহসিন নামে একজনের কথা জেনেছি। তার কাছে অধিকাংশ পাসপোর্ট আছে।” তিনি জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা কবে এবং কোন ভিসায় বাংলাদেশে এসেছেন, তা জানার চেষ্টা করা হবে।
কাউন্টার টেরোরিজমের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. শামীম হোসাইন বলেন, “আমরা তাদের কাছে পাওয়া ডিভাইসগুলো ফরেনসিক করব। তখন আরও অনেক কিছু বের হয়ে আসবে।”
সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) ফয়সাল আহমেদ বলেন, “তাদের কাছ থেকে ১৩৪টি মোবাইল ফোন ও ৫৭টি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ পাওয়া গেছে। তবে কারও কাছে কোনো পাসপোর্ট পাওয়া যায়নি।”
তিনি জানান, তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র ও একটি কম্বোডিয়ার চাকরির কার্ড পাওয়া গেছে। পুরো ভবনটি ভাড়া নিয়ে সেখানে অনলাইনে বিভিন্ন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছিল বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের সঙ্গে দেশি-বিদেশি কিছু চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ৬৩ বিদেশির সবাইকে প্রতারক বা অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া।
এখন মূল প্রশ্ন—১৭০টি ডিজিটাল ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষায় কী তথ্য পাওয়া যায় এবং ‘মহসিন’সহ স্থানীয় ও বিদেশি সহযোগীদের ভূমিকা কতটা ছিল। একই সঙ্গে বিদেশিদের বাংলাদেশে আনা, ভবন ভাড়া নেওয়া, পাসপোর্ট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কথিত অনলাইন কর্মকাণ্ডের পুরো চিত্রও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায়।
